লেখক জাহেদুল ইসলাম আল রাইয়ানঃ- যে ভূমিতে একদিন কাবার ছায়া পড়ে সূর্যও থমকে দাঁড়াত, যে বালুকণায় মিশে ছিল নবুয়তের ধ্বনি—আজ সেই ভূমির বাতাসে ভেসে আসছে এক ভিন্ন সুর। সেটা সূরা নয়, বরং সুরার গন্ধ। সৌদি আরব, যাকে দুনিয়া চিনত পবিত্রতার প্রতীক বলে, আজ সে দেশই শিরে তুলেছে এমন এক সিদ্ধান্ত, যার প্রতিধ্বনি কেবল রিয়াদের রাজপথে নয়, ধ্বনিত হচ্ছে মুসলিম হৃদয়ের অন্তস্তলে।
২০২৫ সালের শুরুতেই ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে সৌদি সরকার ঘোষণা করে—রিয়াদে ‘স্পেশাল লাইসেন্সপ্রাপ্ত অ্যালকোহল স্টোর’ চালু হয়েছে। বলা হচ্ছে, এই দোকান শুধুমাত্র অমুসলিম কূটনীতিকদের জন্য, কঠোর রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়ায় নিয়ন্ত্রিত। কার্ডধারী ব্যতীত কেউ প্রবেশ করতে পারবে না, নির্দিষ্ট পরিমাণের বাইরে বিক্রি নিষিদ্ধ। যেন এক আধুনিক ক্যালিব্রেটেড প্রলোভনের প্যাকেট—ধর্মের গণ্ডি অক্ষুণ্ন রাখার অভিনব প্রচেষ্টা।
কিন্তু একটি প্রশ্ন নিঃশব্দে হেঁটে আসে রাজপ্রাসাদের ছায়া পেরিয়ে কাবার গিলাফ ছুঁয়ে—”হারাম কি ব্যবস্থাপনায় বদলায়?”
ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের নেতৃত্বে সৌদি আরব এখন এক নতুন যুগে প্রবেশ করেছে। ভিশন ২০৩০-এর রূপকল্পে দেশটিকে বানানো হচ্ছে এক আধুনিক মধ্যপ্রাচ্য—যেখানে সিনেমা হল, মিউজিক কনসার্ট, ডিজে পার্টি, গ্লোবাল ইনভেস্টমেন্ট সামিট আর ফ্যাশন উইকের সাথে তাল মেলাচ্ছে মরুভূমির বুকে জেগে ওঠা মেগাসিটি নিওম। এত দিন ধরে যারা বলেছে “ইসলাম কোনো কনফারেন্স না, বরং পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা”—তারা আজ দেখছে, সেই জীবনব্যবস্থার বুকে নেমে এসেছে বিনোদনের ছুরি।
রিয়াদে সেই দোকানটি এখন কূটনীতিকদের জন্য উন্মুক্ত। পণ্য তালিকায় রয়েছে প্রিমিয়াম হুইস্কি, বিদেশি ওয়াইন, বিয়ার, ভদকা—যেগুলোর প্রতিটিই এক সময় ‘ধর্মদ্রোহী আমদানির’ তালিকায় পড়ত। অথচ আজ রাষ্ট্রই তার কাঁধে নিচ্ছে বিক্রয়ের দায়। আরও বলা হচ্ছে, ভবিষ্যতে নির্দিষ্ট রিসোর্ট ও আন্তর্জাতিক হোটেলগুলোতেও নির্ধারিত শ্রেণির অতিথিদের জন্য সীমিত অ্যালকোহল পরিবেশনের অনুমতি দেওয়া হবে।
রাষ্ট্র এখন যুক্তি দিচ্ছে—”এই সিদ্ধান্ত ইসলামী মূল্যবোধের পরিপন্থী নয়, কারণ এতে মুসলিমদের ওপর কোনো প্রভাব নেই।” এমন যুক্তি যেন সেতু তৈরি করছে এক গভীর বিশ্বাসঘাতকতার উপত্যকায়, যেখানে ইসলামকে রাখা হচ্ছে শুধু প্রতীক হিসেবে—একটি গম্বুজ, একটি মিনার, একটি প্রাচীন চিহ্নের মতো।
তবে এই প্যারাডক্স সৌদি আরবের ভেতরে নিরবধি চলা দ্বৈততারই এক পরিণতি। একদিকে রাষ্ট্র ‘দ্য ল্যান্ড অফ টু হোলি মস্কস’—অন্যদিকে একই রাষ্ট্রে এখন বৈধভাবে ড্রাইভ-ইন সিনেমা, কনসার্টে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে বানানো আইনের বুননে ধর্মের বয়ান কেবল রয়ে গেছে সংবিধানের শিরোনামে।
এই দ্বন্দ্বের রক্তক্ষরণ সবচেয়ে বেশি ঘটছে সাধারণ সৌদি নাগরিকের হৃদয়ে। কেউ মুখে বলছে না, কিন্তু ভেতরে বাজছে অজস্র প্রশ্ন। মক্কা-মদিনার পবিত্রতা কি এখন শুধুই ভূগোল? ইসলামী আইনের কাঠামো কি শুধু পাণ্ডুলিপির অলঙ্কার? রাষ্ট্র যদি তার পবিত্রতা বিকিয়ে দেয়, তবে জনগণ কোন মূল্যে তা ধরে রাখবে?
এমতবস্থায় সৌদি সরকার যে সুরাটি খুলেছে, তা শুধু বোতল নয়—এ এক আদর্শভিত্তিক বিপর্যয়ের সিগন্যাল। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও কূটনীতির প্রলোভনে শরিয়াহর নিষেধাজ্ঞাকে বারবার ‘পুনর্ব্যাখ্যা’ করা হচ্ছে। অথচ শরিয়াহ কোনো কনফারেন্স চুক্তি নয়, যে প্রতিবারই ‘সংস্কার’ হবে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের ছাপায়।
আমরা হয়তো একদিন ইতিহাসের পাতা ওলটাবো, এবং সেখানে লেখা থাকবে—”সৌদি আরব প্রথমে মদের অনুমতি দিয়েছিল অমুসলিমদের জন্য, তারপর পর্যটকদের, এরপর সম্মেলন হোটেলগুলোতে, একসময় হয়তো আমজনতার অজান্তে ঢুকে গেল প্রতিটি আধুনিক শহরে।”
তখন হয়তো মক্কার মসজিদুল হারামের পাশে বিলবোর্ড ঝুলবে “হ্যাপি আওয়ার” অফারের বিজ্ঞাপন নিয়ে। কাবার ছায়া পেরিয়ে যাবে আলোর মতো ঝলমলে, অথচ অন্তঃসারশূন্য এক সভ্যতার দিকে।
লেখক ও কলামিস্ট, শিক্ষার্থী আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়,কায়রো,মিশর
Leave a Reply